অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর গ্রেপ্তার
সাতক্ষীরার দেবহাটায় সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে ধারণ করা ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় এবং ব্ল্যাকমেলের অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাকে চণ্ডীপুর গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়, যেখানে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে এক অভিনব অপরাধ চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর এই ধরনের সাইবার অপরাধ সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে, যা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনি অধিকার সুরক্ষায় গভীর ভাবনার জন্ম দেয়।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা, ৩ নভেম্বর ২০২৬ — ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় এবং সামাজিক হেনস্তার এক ঘৃণ্য অপরাধের জালে ফেঁসে গেছেন স্থানীয় পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আব্দুল্লাহ আল মামুন। মঙ্গলবার রাতে দেবহাটা উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রাম থেকে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করে। দেবহাটা উপজেলার চণ্ডীপুর প্রি-ক্যাডেট স্কুলের পরিচালক করিম উল্লাহ মাস্টারের ছেলে আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ওঠা এই চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেলের ঘটনায় গোটা জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার বিবরণে জানা যায়, গত ১ নভেম্বর নওয়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও সাতক্ষীরার বাসিন্দা সাহেব আলী বাদী হয়ে সাতক্ষীরা সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন, যেখানে সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জিসান বাবুলকে প্রধান এবং আব্দুল্লাহ আল মামুনকে দ্বিতীয় ও ভুক্তভোগীর দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ওরফে মৌসুমীকে তৃতীয় আসামি করা হয়েছে। প্রায় ছয়-সাত মাস আগে পারিবারিক বিরোধের জেরে বাদী তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর অভিযুক্ত চক্রটি বাদীর অজান্তে ধারণ করা ব্যক্তিগত ও দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি সংগ্রহ করে। গত ১৫ অক্টোবর থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পরবর্তী সময়ে ৫০ হাজার টাকায় সমঝোতার পরও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেওয়ায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২-এর বিভিন্ন ধারা অনুযায়ী এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর ‘সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল’ নামক ফেসবুক আইডি এবং ১ নভেম্বর মামুনের ব্যক্তিগত আইডি থেকে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২-এর প্রদত্ত নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। মামলার বাদী সাহেব আলীর অভিযোগ অনুসারে, অভিযুক্তরা প্রথমে পাঁচ লাখ, পরে তিন লাখ এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করে অনবরত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। প্রমাণ হিসেবে অডিও রেকর্ডিং, স্ক্রিনশট ও ডিজিটাল ভিডিও সংরক্ষিত থাকার পরেও সাইবার অপরাধের এই বেপরোয়া বিস্তার সাধারণ মানুষের মাঝে আইনি সুরক্ষা নিয়ে মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে।
সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কনটেন্ট তৈরির আড়ালে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর ও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধের পেছনে থাকা মূল অর্থপ্রবাহ বা প্ররোচনাকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা সময়ের দাবি। জনগণের ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তা এবং সাইবার জগতের নৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য: "আমার ব্যক্তিগত ও গোপন মুহূর্তের ভিডিও অনৈতিকভাবে সংগ্রহ করে দিনের পর দিন ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছিল; টাকা দেওয়ার পরও ফেসবুকে তা ছড়িয়ে আমাকে সামাজিকভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে—আমি এর সুষ্ঠু ও কঠোর বিচার চাই।" — সাহেব আলী, মামলার বাদী ও স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান।
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য: "ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে সাইবার স্পেসে ব্ল্যাকমেল করা ও পর্নোগ্রাফি আইন প্রয়োগের মতো অপরাধ সমাজে ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ও ডিজিটাল সাক্ষরতা না বাড়লে এ ধরনের অপরাধ থামানো যাবে না।" — সাইবার অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞ।
অফিশিয়াল বক্তব্য: "পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেল ও আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এবং বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।" — জামিল কবির, পরিদর্শক (তদন্ত), সাতক্ষীরা সদর থানা।
মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!
মন্তব্য করুন (নাম ছাড়াও করতে পারবেন)