রেমিট্যান্স প্রবাহে ১৪.৭ শতাংশ বিশাল লাফ, স্বস্তিতে দেশের রিজার্ভ ও অর্থনীতি
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১.৬৯ বিলিয়ন ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৪.৭ শতাংশ বেশি। কেবল ১ নভেম্বরেই এসেছে ২২২ মিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই দিনের ৪৩ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি অভাবনীয় বৃদ্ধি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চলমান চাপ কাটিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে প্রবাসীদের এই অক্লান্ত রেমিট্যান্স যুদ্ধ এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। বৈদেশিক খাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার এই ধারা ধরে রাখতে হুন্ডি প্রতিরোধ ও প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কঠোর নীতিগত বাস্তবায়ন এখন অত্যন্ত জরুরি।
পর্যবেক্ষণওয়ালা বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৬ — চরম বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির উদ্বেগের মধ্যেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে জাতীয় অর্থনীতি; চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (১ জুলাই থেকে ১ নভেম্বর) প্রবাসীরা রেকর্ড ১১ হাজার ৬৮৭ মিলিয়ন ডলার (১১.৬৯ বিলিয়ন ডলার) রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ে আসা ১০ হাজার ১৯২ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় এই আয় সংগৃহীত হয়েছে ১৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিতে। গত ১ নভেম্বর একদিনেই দেশে এসেছে ২২২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা ২০২৫ সালের ১ নভেম্বরের ৪৩ মিলিয়ন ডলারের হিসাবকে বহুদূরে ফেলে দিয়ে অর্থনৈতিক নতুন রেকর্ডের সূচনা করেছে।
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ পথে আনার ব্যাংকিং প্রণোদনা এবং হুন্ডি চক্র দমনে কঠোর তদারকির ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক গতি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালার আলোকে রেমিট্যান্স আসার এই ধারাবাহিকতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে সরাসরি সহায়তা করছে। ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয়ের চাপের মধ্যে প্রবাসী আয়ের এই ধারাবাহিক সাফল্য দেশের বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করছে।
উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রমবাজারে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সময়োপযোগী অর্থ প্রেরণ অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ১.৪৯ বিলিয়ন ডলার অর্জন আমদানিনির্ভর বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। তবে অর্থনীতির মূলধারায় এই মূলধন কার্যকরভাবে বিনিয়োগ করা না গেলে এবং প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে এই ক্ষণস্থায়ী প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও দেশীয় অর্থ ব্যবস্থার ওপর তৈরি হওয়া বৈশ্বিক চাপ কাটিয়ে উঠতে এই রেমিট্যান্স প্রবাহকে রূপান্তরমূলক শক্তিতে পরিণত করা প্রয়োজন। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত ধারাবাহিকতা রক্ষা, প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান এবং ব্যাংকিং সেবার মান আরও সহজীকরণ করার বিকল্প নেই। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এই সুফল যেন ব্যাংকগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকে এখন কঠোর নজরদারি দরকার।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য: "বিদেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত খাটছি কেবল দেশের পরিবার আর জন্মভূমির অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে; বৈধ পথে কষ্টার্জিত টাকা পাঠানোর সুফল যখন অর্থনীতিতে দেখি, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।" — মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী এক বাংলাদেশি কর্মী।
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য: "রেমিট্যান্সে ১৪.৭ শতাংশের এই প্রবৃদ্ধি রিজার্ভের ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে দারুণ সহায়ক। তবে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর না করে হুন্ডি প্রতিরোধ জোরদার ও রফতানি খাতকে একই সঙ্গে চাঙা করতে না পারলে এই সুবিধার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।" — অর্থনীতি ও ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞ।
অফিশিয়াল বক্তব্য: "প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের অমূল্য অবদানের প্রতিফলন। বৈশ্বিক খাতের স্থিতিশীলতা ও রিজার্ভের ভিত শক্ত রাখতে আমরা ব্যাঙ্কিং প্রণোদনা ও নিরাপত্তা অব্যাহত রাখছি।" — বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র।
মন্তব্য (0)
এখনও কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!
মন্তব্য করুন (নাম ছাড়াও করতে পারবেন)